ধ্রুপদী বা সনাতন উদারনীতিবাদ সম্পর্কে অলোচনা

ধ্রুপদী বা সনাতন উদারনীতিবাদ সম্পর্কে অলোচনা কর। উদারবাদ ও নয়া উদারবাদ

ধ্রুপদী বা সনাতন উদারনীতিবাদ সম্পর্কে অলোচনা কর

‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’ অনুযায়ী উদারনীতিবাদ হল সেই ধারণা, যা সরকারের কার্যপদ্ধতি ও নীতি হিসেবে, সমাজ গঠনের নীতি হিসেবে এবং ব্যক্তি ও সমাজের একটি জীবনাদর্শ রূপে স্বাধীনতাকে গ্রহণ করে। হবসহাউস-এর মতে উদারনীতিবাদ হল ব্যক্তির আত্মপরিচালনার ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে সমাজ গঠনের বিশ্বাস। সারতোরির ব্যাখ্যায় ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনগত সংরক্ষণ এবং সাংবিধানিক রাষ্ট্রের তত্ত্ব ও অনুশীলনকে উদারনীতিবাদ বলা হয়। সাধারণভাবে এককথায় উদারনীতিবাদ হল যে কোনো ধরণের কর্তৃত্বের নীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করা। এই মতবাদের মূল কথা ব্যক্তি ও তার স্বাধীনতা।

ধ্রুপদী বা সনাতন উদারনীতিবাদের বিশিষ্ট তাত্ত্বিক হিসেবে যাঁদের নাম উল্লেখযোগ্য তাঁরা হলেন জন লক, অ্যাডাম স্মিথ, জেরেমি বেন্থাম, জন স্টুয়ার্ট মিল প্রমুখ। সাধারণভাবে বলা যায় জন লক থেকে শুরু করে স্টুয়ার্ট মিলের পূর্ব পর্যন্ত সকল উদারনীতিবাদীরা হলেন সনাতনী উদারনীতিবাদী। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্ণমেন্ট’-এ ইংরেজ রাষ্ট্র দার্শনিক লক উদারনীতিবাদের গোড়াপত্তন করেন। এই গ্রন্থে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেছেন যে, “মানুষ প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন – ফলত রাষ্ট্র গঠনের পরেও এই অধিকার সে পূর্বের ন্যায় ভোগ করবে, তবে এই অধিকার সার্বিক স্বার্থে কিছুটা সীমিত রাখতে পারে।” লকের মতে জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে ব্যক্তি কখনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আপোস করে নি।

অ্যাডাম স্মিথ তাঁর ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ গ্ৰন্থে উল্লেখ করেছেন, “একটি সমাজের আসল শক্তি হল ব্যক্তি স্বার্থ।” স্মিথ সরকারি কাজকর্মকে সীমিত রেখে ব্যক্তি স্বাধীনতা অর্থাৎ ব্যক্তির আর্থিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় সকল ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত স্বাধীনতাকে সমর্থন করেছেন। আডাম স্মিথকে অর্থনৈতিক উদারনীতিবাদীও বলা যায়। তাত্ত্বিকভাবে অবাধ অর্থনৈতিক ব‌্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নীতি প্রবর্তন করেন অ্যাডাম স্মিথ। বিশেষত ব্যবসাবাণিজ্য ক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব কম নিয়ন্ত্রণের পক্ষপাতী ছিলেন স্মিথ। সনাতনী উদারনীতির একটি বিশেষরূপ অর্থনৈতিক উদারনীতিবাদ।

হিতবাদী জেরেমি বেন্থাম তাঁর ‘ম্যানুয়েল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’ (Manual of Political Economy) গ্রন্থে এবং মিল তাঁর ‘অন লিবার্টি’ (On Liberty) গ্রন্থে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণকে ন্যূনতম করার দাবি জানিয়ে ব্যক্তির নিজ সম্পর্কিত সার্বভৌমত্ব ভোগ করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত হিতবাদ বা উপযোগবাদের মূল কথা বুদ্ধিমান মানুষ এমন কিছু নীতি মেনে চলবে যাতে সুখের পরিমাণ হবে সর্বাধিক এবং সবচেয়ে কম হয় দুঃখের পরিমাণ। উপযোগবাদীদের দ্বারা ‘সর্বাধিক সুখ’ এবং ‘সর্বন্যূন দুঃখ’ – এই নীতি প্রসার করার চেষ্টা হয়।

সর্বোপরি, সামগ্রিকভাবে বলা যায় সনাতনী বা ধ্রুপদী উদারবাদের বৈশিষ্ট্য হল পৌর স্বাধীনতা, রাজত্ব সংক্রান্ত স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সামাজিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, পারিবারিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জনগণের সর্বভৌমিকতা।

Leave a Comment