সমকালীন উদারনীতিবাদ বা নয়া উদারনীতিবাদের বৈশিষ্ট্য

সমকালীন উদারনীতিবাদ বা নয়া উদারনীতিবাদের বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর। উদারবাদ ও নয়া উদারবাদ

সমকালীন উদারনীতিবাদ বা নয়া উদারনীতিবাদের বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর

বর্তমান বিশ্বে সমাজ ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ একাধিক বিষয় দ্বারা নির্ধারিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ক তত্ত্বগুলিও একাধিক। তার মধ্যে উদারনীতিবাদ একটি অন্যতম রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ কয়েকটি ধারণাকে কেন্দ্র করে সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে উদারনীতিবাদ তার রূপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ব্যক্তির প্রাধান্য, তার স্বাধীনতা, অধিকার, মতামত, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ, সমাজের নিজস্বতা প্রভৃতির উপর ভিত্তি করে দার্শনিকরা তাদের মতামত গড়ে তোলেন, যা উদারনীতিবাদের রূপ ধরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

David Held তাঁর ‘Political Theory and Modern State’ গ্রন্থে উল্লেখ করছেন, “নয়া উদারনীতিবাদ হল সেই রাজনৈতিক মতাদর্শ যা সমাজ ও ব্যক্তির কল্যাণের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের ভূমিকার জোরালো বিরোধিতা করে ব্যক্তিমালিকানাকে উৎসাহিত করাকে লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র দাবিদার হিসেবে গ্রহণ করে।” নয়া উদারনীতিবাদকে নয়া দক্ষিণমতবাদ বলা হয়, যা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে সংকুচিত করে ব্যক্তি উদ্যোগকে সম্প্রসারিত করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে। উদারনীতিবাদকে যুগোপযোগী করে তুলতেই এফ. এ. হায়েক, মিল্টন, ফ্রিডম্যান, ডেভিড হেল্ড, রবার্ট নোজিক প্রমুখরা প্রয়াস করেছেন। এই নয়া উদারনীতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা বৈশিষ্ট্যগুলি হল –

  • প্রথমত, এই তত্ত্বের অন্যতম প্রচার হল পীড়নমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সর্বাপেক্ষ কম।
  • দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভাঙ্গন, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অবসানের প্রেক্ষাপটে মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রসারের পথ প্রশস্ত হয়। কোনো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত উৎপাদক, বিক্রেতা ও ক্রেতারাই তাদের অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্ত দ্বারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। 
  • তৃতীয়ত, সরকারি ক্ষমতা হ্রাসের মাধ্যমে ব্যক্তি উদ্যোগের সম্প্রসারণ।
  • চতুর্থত, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা অবাধ স্বাধীনতাকে সমর্থন করা।
  • পঞ্চমত, রাষ্ট্র ও পুরসমাজের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে পুরসমাজের স্বাতন্ত্র্য বৃদ্ধির কথা বলা হয়। এরূপ মতের মাধ্যমে নয়া উদারনীতিবাদ দ্বৈত গণতন্ত্রীকরণ নীতির প্রবর্তনের উপর জোর দেয়। 
  • ষষ্ঠত, নয়া উদারবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট হল এটি দায়বদ্ধতা নীতির উপর গুরুত্ব দেয়। তাই সরকারি নীতি প্রণয়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ও জনগণের বা তাদের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের উপর অধিকমাত্রায় তাত্ত্বিক গুরুত্ব আরোপ করে।

সমাজের সামগ্রিক বিকাশে ব্যক্তির গঠন মূলক ভূমিকা প্রশংসনীয় হলেও নয়া উদারবাদ ব্যক্তির ভূমিকাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তাছাড়া পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নানান সংকট রাষ্ট্র ব্যবস্থা না মেটাতে পারলে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে এককভাবে দায়ী করাও পক্ষপাতদুষ্ট। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরাধীন দেশগুলি অধিক পরিমাণে মুক্তি পাওয়ায় উপনিবেশিক শক্তিগুলির অগ্রগতির জোয়ার হ্রাস পায়। এরূপ পরিস্থিতিতে ওই সকল রাষ্ট্রের ভূমিকা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার এও অনস্বীকার্য যে বিশ্বায়ন ও নয়া উদারবাদ একে অপরের সহায়ক হয়ে অগ্রসর হতে চাইলেও বিশ্বায়নের সদর্থক ভূমিকা সম্পর্কিত সংশয় আজও পৃথিবীর সকল মানুষের কাটে নি। যদিও গুটিকতক রাষ্ট্রের প্রবল প্রতাপে তৃতীয় বিশ্ব সহ অনেক দুর্বল রাষ্ট্র তা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

Leave a Comment