স্বাধীনতা রক্ষার কবচগুলি আলোচনা কর

মৌলিক ধারণা – স্বাধীনতা রক্ষার কবচগুলি আলোচনা কর।

স্বাধীনতা রক্ষার কবচগুলি আলোচনা কর- মৌলিক ধারণা

ল্যাস্কি উল্লেখ করেছেন, “সমাজে মুষ্টিমেয় শ্রেণির জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা থাকলে তা গরিষ্ঠ অংশের স্বাধীনতার পরিপন্থী হয়ে ওঠে।” একজনের স্বাধীনতা অন্যের দ্বারা সাহায্যপুষ্ট। ল্যাস্কির মত হল স্বাধীনতার রক্ষা কবচ ব্যতীত সকলের স্বাধীনতার সুনিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে স্বাধীনতা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও স্বাধীনতার রক্ষাকবচের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সকলে সহমতও পোষণ করেন।

এই রক্ষা কবচগুলি হল –

প্রথমত, স্বাধীনতার রক্ষা কবচ হিসেবে সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলির লিপিবদ্ধকরণকে উল্লেখ করা হয়। সংবিধানে মৌলিক অধিকার সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকলে একদিকে নাগরিকরা যেমন সচেতন সতর্ক দৃষ্টি রাখতে সক্ষম হয় অন্যদিকে সরকারকেও অধিকারগুলি সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়।

দ্বিতীয়ত, মন্টেস্কু, ম্যাডিসন প্রমুখরা ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতি বাস্তবায়নকে স্বাধীনতার অন্যতম রক্ষাকবচ হিসেবে উল্লেখ করেন। সরকারী কার্য পরিচালনার তিনটি বিভাগ – শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ যদি নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পাদন করে তাহলে ব্যক্তি স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়। অবশ্য সম্পূর্ণ ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ সম্ভব নয়। অনেকে মনে করেন বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রিকরণ আবশ্যিক আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতির আদর্শ হলেও ব্রিটেনে এই নীতি অস্তিত্বহীনতা ব্রিটিশদের ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে খুব একটা বঞ্চিত করে নি।

তৃতীয়ত, অধ্যাপক এ. ডি. ডাইসি প্রমুখ মনে করেন ‘আইনের অনুশাসন’ স্বাধীনতার অন্যতম রক্ষা কবচ। আইনের অনুশাসন অনুযায়ী আইনের প্রাধান্য সার্বিক ও সর্বোচ্চ। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং আইন দ্বারা নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষিত। সরকারের স্বৈরাচারিতা আবার পদাধিকারীদের অধিক স্বাধীনতা ভোগ সকল কিছুই আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। অবশ্য ল্যাস্কি মনে করেন ‘বৈষম্যহীন সমাজ’ ছাড়া আইনের দৃষ্টিতে সাম্য হতে পারে না।

চতুর্থত, প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গণভোট, গণ উদ্যোগ, পদচ্যুতি প্রভৃতি স্বাধীনতার অন্যতম রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে। সরকার নাগরিকদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে নাগরিকরা এই সকল পদ্ধতি প্রয়োগ করে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। সুইজারল্যান্ডের ন্যায় স্বল্পায়তন বিশিষ্ট রাষ্ট্রে এই পদ্ধতি চালু আছে।

পঞ্চমত, জনগণের চেতনা ও সাহসিকতা এককথায় সদা জাগ্রত জনমত স্বাধীনতা রক্ষা কবচ হিসেবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার প্রতি নাগরিকদের তীব্র আগ্রহ ও সার্বিক ত্যাগ স্বীকারের প্রস্তুতি ব্যতীত স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার জন্য অধিক মূল্য দিতে হয়। প্লেরিক্লিস উল্লেখ করেন, “চিরন্তন সর্তকতাই স্বাধীনতার মূল্য”। ল্যাস্কির ভাষায়, “স্বাধীনতার মূল্য হল চিরন্তন এবং নিরলস সতর্কতা।”

ষষ্ঠত, দায়িত্বশীল সরকার বা শাসন ব্যবস্থা স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। দায়িত্বশীল শাসন ব্যবস্থায় আইন সভা ও জনগণের প্রতিনিধিদের নিকট সরকারকে দায়িত্ববদ্ধ থাকতে হয়। এছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির গঠনমূলক সুসংবদ্ধ বিরোধী অবস্থান সরকারকে জনগণের স্বাধীনতা পরিপন্থী কাজ করতে বাধা দেয় ও জনমতকে সতর্ক ও সজাগ রাখে।

সপ্তমত, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ স্বাধীনতার রক্ষা কবচ হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অধ্যাপক ল্যাস্কি উল্লেখ করেছেন, “যে রাষ্ট্রের হাতে অধিক মাত্রায় ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত সেখানে স্বাধীনতা থাকতে পারে না।” স্থানীয় স্বায়ত্ব শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ নাগরিকদের পূর্ণমাত্রায় স্বাধীনতাভোগের সুযোগ করে দেয়।

উপরিউক্ত রক্ষা কবচগুলির সামগ্রিক বাস্তবায়ন ঘটিয়ে আর্থিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমেই একমাত্র যথার্থ স্বাধীনতা রক্ষা করা যায়। তৎসহ স্বাধীনতা রক্ষা করতে রাজনৈতিক সচেতনতার প্রসার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, যা শিক্ষার অগ্রগতির দ্বারা সম্ভব।

Leave a Comment