স্বাধীনতা ও সাম্য এই ধারণা দুটি ব্যাখ্যা করো এবং তাদের সম্পর্ক দেখাও।-মৌলিক ধারণা
স্বাধীনতা ও সাম্য এই ধারণা দুটি ব্যাখ্যা করো এবং তাদের সম্পর্ক দেখাও
স্বাধীনতা ও সাম্যের ন্যায় আর কোনো রাজনৈতিক আদর্শ সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনে প্রেরণা যোগায় নি, বিতর্কের সৃষ্টি করে নি। আক্ষরিক অর্থে স্বাধীনতা বলতে ইচ্ছামত কাজ করার অবাধ ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রণবিহীনতা বোঝায়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা অনিয়ন্ত্রিত বা অবাধ স্বাধীনতা স্বীকার করেন না। স্বাধীনতার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক থেকে বিচার করা যায়। অধ্যাপক ল্যাস্কির মতে, স্বাধীনতা বলতে সেই সব সামাজিক অবস্থার ওপর থেকে বাধা নিষেধের অপসারণ বোঝায়, যা সভ্য জগতে মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের পক্ষে অপরিহার্য। কিন্তু স্বাধীনতা শুধু নিয়ন্ত্রণের অভাব বললে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার ইতিবাচক দিকও আছে। ল্যাস্কি বলেছেন যে, স্বাধীনতা হল সেই পরিবেশের সযত্ন সংরক্ষণ যে পরিবেশে মানুষ আপন ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশের সুযোগ লাভ করে। সুতরাং, অধিকারের স্বীকৃতির দ্বারাই স্বাধীনতার পরিবেশ গড়ে ওঠে। অবশ্য সকলের স্বাধীনতা বা অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কিন্তু নিয়ন্ত্রণ মানতে হয়।
সাম্যের ধারণাটিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। সাম্য বলতে সকল মানুষ সমান বোঝায়। কিন্তু কোন অর্থে মানুষের সঙ্গে মানুষের সমান অবস্থা থাকতে পারে? স্বাভাবিক বা প্রকৃতিগতভাবে মানুষে মানুষে পার্থক্য আছে। সুতরাং, সাম্য বলতে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সকলের অভিন্নতা বোঝায় না। সাম্য বলতে প্রাথমিকভাবে বোঝায় বিশেষ সুযোগ-সুবিধার অনুপস্থিতি। জাতি, বর্ণ, বংশ বা সম্পত্তিগত কারণে কেউ রাজনৈতিক বা সামাজিক অক্ষমতা বা অসামর্থ্যের স্বীকার হবে না। নাগরিক হিসাবে একজন যে সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে সমর্থ, অপরের ক্ষেত্রে তার কোনো ব্যতিক্রম হবে না। বিশেষ সুযোগ-সুবিধা স্বীকার করার অর্থ অন্যকে সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা। সুতরাং, সাম্য হল সকলের জন্য যথোপযুক্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা। সাম্য তখনই সার্থক হবে যখন রাষ্ট্র প্রত্যেক ব্যক্তির পূর্ণ বিকাশের সমান সুযোগ সৃষ্টি করবে। শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে প্রকৃত সাম্য থাকতে পারে না।
অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ফরাসি বিপ্লবের সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার ধ্বনির মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা ও সাম্যের পারস্পরিক পরিপূরক সম্পর্ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সমর্থকরাও রাজনৈতিক ও আইনগত সাম্যের প্রশ্নে সাম্য ও স্বাধীনতার মধ্যে কোনো বিরোধিতা স্বীকার করেন নি। কিন্তু উনিশ শতকে যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের দাবি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে, তখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী উদারনৈতিক লেখকরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যকে স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে প্রচার করতে থাকেন।
লর্ড অ্যাকটন, টকভিল, লেকি, বেজট প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাম্য ও স্বাধীনতার আদর্শকে পরস্পরবিরোধী বলে প্রচার করেছেন। লর্ড অ্যাকটনের মতে, “সাম্যের জন্য আবেগ স্বাধীনতার আশাকে নির্মূল করে”। এরা সাম্যের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেন নি। স্বাধীনতার নেতিবাচক দিকটি অর্থাৎ, ব্যক্তির আচার-আচরণের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণবিহীনতাকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার পবিত্র বলে স্বীকার করেন। স্বাধীনতা বলতে যদি ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য লাভের নিয়ন্ত্রণবিহীন অধিকার বোঝায়, তাহলে এরূপ অবস্থায় সাম্যের সন্ধান মিলবে না।
কিন্তু অনেক লেখক সাম্য ও স্বাধীনতার এই পরস্পরবিরোধী রূপ স্বীকার করেন না। মেইটল্যাণ্ড, গডউইন, রুশো, টনি, বার্কার, ল্যাস্কি ও মার্কসবাদীরা সাম্য ও স্বাধীনতাকে পরস্পরের পরিপূরক বলে স্বীকার করেন। টনি বলেছেন, “সাম্য স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়, স্বাধীনতার পক্ষে একান্ত প্রয়োজন”। স্বাধীনতার ধারণাকে কার্যকর করতে সাম্যের প্রয়োজন অপরিহার্য। সমাজজীবনে পৌর বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই সার্থক হাতে পারে যখন আইনের দৃষ্টিতে সমানাধিকার স্বীকৃত হয় এবং প্রত্যেক নাগরিক শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সমান সুযোগ লাভ করে। অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণের পর উপযুক্ত অবসর মিললেই স্বাধীন চিন্তার বিকাশ সম্ভব হতে পারে। বিশেষ সুযোগ-সুবিধার অস্তিত্ব স্বাধীনতার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে না।
ল্যাস্কির মতে, স্বাধীনতা হল এমন এক সামাজিক পরিবেশ যার মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তি আপনাকে পূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারে। এই পরিবেশ একমাত্র সকলের সমান অধিকারের ভিত্তিতে সৃষ্টি হতে পারে। স্বাধীনতা বলতে যদি মানবতার নিরবচ্ছিন্ন সম্প্রসারণ বোঝায়, তাহলে সাম্যভিত্তিক সমাজ ছাড়া অন্যত্র সেই স্বাধীনতা সম্ভব নয়। রুশোর ভাষায়, সাম্য ছাড়া স্বাধীনতার অস্তিত্বই সম্ভব নয়।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের চোরাবালির ওপর স্বাধীনতার সৌধ নির্মাণ অবাস্তব। মার্কসবাদী লেখকরা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা এবং শ্রেণিহীন সমাজেই সাম্য ও স্বাধীনতা সকলের জন্য সম্ভব হতে পারে। ধনবৈষম্যমূলক সমাজে স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি সম্ভব নয়।